সরকারি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে করনীয়

সরকারি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে করনীয়

বর্তমানে সারা বিশে^র ন্যায় বাংলাদেশেও করোনা নামক মরনঘাতী ভাইরাসের ছোবলে বাংলাদেশের মানুষ দিশেহারা। যতই দিন যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকারে রুপ নিচ্ছে। তছনছ হয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। হুমকির মাঝে পড়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানাগুলি। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সমাজের গরীব, দুস্থ্য, অসহায় ও খেটে খাওয়া মানুষগুলি। সারাদেশে প্রশাসনিক লকডাউন জারী থাকায় কাজের লোকগুলিও কর্মহীন হয়ে পড়ছে। ঘরে খাদ্যের কোন মজুদ না থাকায় সাহায্য সহযোগিতায়ই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। এভাবে সামনে আর কতদিন পাড়ি দিতে হবে তা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। এই অবস্থায় এসব অসহায় মানুষের মুখে খাবার তোলে দেওয়ার জন্য প্রানান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সেই সাথে সমাজের বিত্তশালী ব্যাক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, স্বেচ্ছা সেবি সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলিও সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছেন তাদের পাশে থাকার। এতকিছুর মাঝেও আশাহত হতে হয় তখন, যখন শোনা যায় এসব অসহায় মানুষের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্ধকৃত ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাত হয়ে যায়। ইতি মধ্যে সারাদেশে এসব অপকর্মের জন্য সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়েছেন অনেকে। এ তালিকায় আছেন কিছু অসাধু চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সরকার দলীয় কতিপয় নেতাকর্মী। এরা যেন মনুষত্ব্য-বিবেক বোধ হারিয়ে প্রতিনিয়ত ত্রাণ সামগ্রী লুটেপুটে খাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায়ই থাকে। কিন্তু এ থেকে উত্তোরণ হওয়া এখন সময়ের দাবী।
আমাদের দেশে এ ধরনের দুর্যোগ নতুন কিছু নয়। আর এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের ত্রাণ সামগ্রী আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা ও অন্যান্য ভাতাদি বিতরণের মূল দায়িত্বে থাকেন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীগণ। আর এদের মাঝেই কেউ কেউ এসব গরীবদের ত্রাণসামগ্রী আত্মসাত করে থাকেন। এদের কিছু খবর মাঝে মাঝে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও অধিকাংশই তথ্য প্রমান না থাকায় থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। প্রশ্ন হলো তাহলে কি এভাবেই চলতে থাকবে? লুটেরারা কি এভাবেই লুটতরাজ করে প্রতিনিয়ত খেয়ে যাবে? না সরকারই এভাবে খাওয়ার জন্য তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে?  যদি তা না হয় তাহলে ত্রাণ সামগ্রী, ভাতাসহ সরকারি যে কোন অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করনে নিন্মোক্ত পদক্ষেপ গুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।  
বাংলাদেশ সরকার দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষনা দিয়ে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইতি মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে যেমনি সাফল্য অর্জন করছেন, তেমনি ভুয়শী প্রশংসাও কুড়াচ্ছেন বিভিন্ন মহলের। তাই এখানেও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এসব অনিয়ম নির্মূল করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে একটি জেলা কিংবা উপজেলায় কি পরিমান ত্রাণ সামগ্রী বা অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তা প্রথমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ফেসবুক পেজে স্টেটাস দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায়ে কোন ইউনিয়নে কি পরিমান বরাদ্দ যাচ্ছে তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও উপজেলা প্রকল্প কার্যালয়ের ফেসবুক পেজে তা নিয়মিত আপডেটের মাধ্যমে জানিয়ে দিবেন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ কাদেরকে এই ত্রাণ সামগ্রী বা আর্থিক সহযোগিতা করছেন, তার পরিমান উল্লেখ করে নাম ঠিকানাসহ তালিকা প্রস্তত করে নিয়মিত তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে আপডেট করবেন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ফেসবুক পেইজ খোলা ব্যাধ্যতামুলক করতে হবে।  এর মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগন যেমন সহজেই মনিটরিং করতে পারবেন, তেমনি পুরো প্রক্রিয়ায় কোন অসংগতি আছে কি না তা সমাজের সচেতন ব্যক্তিবর্গ ও মিডিয়ার লোকজন সহজে অবহিত হতে পারবেন।
অতিদরিদ্রদের মাঝে ১০টাকা কেজি চাল বিক্রির ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম অভিযোগের কথা শোনা যায়। এক্ষেত্রে ডিলারগণ বরাদ্ধকৃত চালের একটা অংশ উপকারভোগীদের মাঝে বিক্রি করে বাকী অংশ নামে-বেনামে তালিকা করে মাষ্টার রোলে নিজেরাই  স্বাক্ষর করে কালো বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে দেয়। তাদের মাস্টার রোলের তালিকা বাহিরে প্রকাশ না হওয়ার কারনে এই চক্রটি থাকেন ধরা চোঁয়ার বাইরে।  এক্ষেত্রে দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার, নাম ঠিকানাসহ  তালিকা প্রস্তত করে সংশ্লিষ্ট অফিসের ফেসবুক পেইজে নিয়মিত আপলোড করে সর্ব মহলকে অবহিত করলে অনিয়ম দূর হবে।  
এছাড়া বয়ষ্ক-ভাতা, বিধবা ভাতা কার্ড বিতরনে জাতীয় পরিচয়পত্রের বয়স টেম্পারিং, কিংবা কার্ডের বিপরীতে উপকারভোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, উপকরন প্রদান, যেকোন উন্নয়নমূলক কাজসহ সকল ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রতিহত করতে আলাদা করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসা প্রধানসহ গণমাধ্যম কর্র্মীদের অন্তর্ভুক্ত করলেও সুফল আসতে পারে। সর্বোপরি উপরোক্ত ধাপ গুলো বাস্তবায়ন ও আইনের কঠোর প্রয়োগসহ বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে দেশের নিস্কৃয় প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়েব পেজের প্রতিটি বিভাগ নিয়মিত আপডেট করলে এই বিভাগে অনেকটা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
মো: জায়েজুল ইসলাম, সাধারন সম্পাদক, পূর্বধলা প্রেসক্লাব ও সহকারি শিক্ষক (আইসিটি), ঘাগড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, পূর্বধলা, নেত্রকোনা।