মালিক-শ্রমিক

মালিক-শ্রমিক

সেই বিকেলে আমি দু’বার ভিজেছি। প্রথমবার বৃষ্টির জলে, দ্বিতীয় বার দৃষ্টির জলে। শুনেছি ফাতেমার সংগ্রামী জীবনের রং হীন অলি-গলিতে ইচ্ছেরা নিত্য মাথা ঠুকে মরে যাওয়ার কথা। রাক্ষুসে ক্ষুধা বারবার কামড়ে ধরে শ্বাসনালীতে। হাহাকার করে বেঁচে থাকার ক্ষণ। সেই সুযোগে দুনিয়ার ভদ্র জাতিরা করে তামাশা । ফাতেমা গর্জে ওঠে বলে মেয়ে রূপে জন্ম নেওয়া মানুষ আমি, আর ভয় করিনা। জন্মের পর বাবা খুব কেঁদে ছিলো। দাদী মায়ের মুখ দেখেনি বহুদিন। প্রতিবেশীরা মাকে নিয়ে হাসাহাসি করে বাবাকে উস্কে দিয়ে বলে আবার ও মাইয়া অইছে? এইবার বউ বদলাও না অইলে বংশে প্রদীপ জ্বলবো না । ফু-ফুরা রাইত দিন বাবার কান ভাঙছে মাকে তাড়নোর লাগি। এই অলক্ষীটারে বিদায় কইরা আবার বিয়া করো। মা পাষাণে বুক বাইন্ধা রুখে কাড়াইলো, কইলো তোমার মা, আমার মা মাইয়্যা রুপে জন্ম নিলে যদি পাপ না অয়, তো আমার মাইয়্যাদের ও কোন পাপ নাই। স্পষ্ট কইলো রাখো বা ছাড়ো আমার মাইয়্যাদের আমি ছাড়বো না । যাক, একদিন নিজের চেষ্টা বাবার মন জয় করেছি বটে । চাকরি করি এক নরক কারখানা । সকাল আটটা ফ্যাক্টরি তে ঢুকি রাত দশটা বেড় হই । মাঝখানে এক ঘন্টার বিরতি । কাজে চাপ বেশি থাকলে এক ঘন্টার জায়গা আধ ঘণ্টা, এবং দশটার পরিবর্তে রাত তিনটা বাইরে বের হই। এত রাতে যানবাহন নাই, তারপর হাঁটতে হাঁটতে বাসা পৌঁছতে ভোর হয়ে যায় ।

গেইট তালাবন্ধ, ছিটকে চোরের মতো প্রাচীর টপকে রোজ ভেতরে ঢুকতে হয় । কুকুরের ঘেউ ঘেউ , জিন ভুতের ভয় শরীরের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আসে। শুরু হয় আরেক যুদ্ধ -চুলারপার, কলের ঘর, টয়লেট সবখানে থাকে সিরিয়াল । গোসলখানা চার পাঁচ জন ঢুকে একজনের গায়ের জলে আরেক জন নাইতে নাইতে অভ্যেস অইয়্যা গেছে । তারপর কোন রকমে ধোঁয়া উঠা ভাত আর আলু সিদ্ধ গিলে সঙ্গে কয়টা নিয়ে ফের হাঁটা শুরু। বেশির ভাগ সময়ই সকালে খাওয়ার সময় পাই না । আটটার ভেতরে ফ্যাক্টরি তে না ঢুকলে একশত টাকা হাজিরা বোনাস কেটে নেবে মালিক । তাছাড়া কেন দেরি হলো এ নিয়ে জি এম, পি এম পর্যন্ত দরবার চলবে । মেয়ে মানুষ কত আর সহ্য হয়! কাজ আর কাজ চোখে মুখে ধোঁয়া উঠে,গাঢ় নাড়ানোর সময় নাই । একটু হেলা করলে কাজ জমে মাথার উপর উঠে। সুপার, ভাইজার,কন্ট্রোলার, জি এম, পি এমের গালাগালি শুনে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে । মাঝে মাঝে বড্ড অবাক হই, বাহির থেকে যখন বায়াররা ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করতে আসেন, তখন আমাদের কারখানার রুপ বদলে যায় । তকতকে গোছানো পরিবেশ, জায়গা জায়গা মিনারেল পানির পাত্র, পরিস্কার গ্লাস, বাথরুমে জুতা এমনকি নানান রঙের পুতুল দিয়ে সাজানো হয় বেবি রুম। যা আদৌ ফ্যাক্টরি তে এই সুবিধা নাই । এইতো কয়েকদিন আগে অপারেটর মিনা আপা গেইট এ বসে তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর অপরাধে চাকুরি হারালো ।

মাতৃকালীন ছুটি ছয় মাস না দিয়ে দেয় তিন মাস । যাক, সারা বছর বাথরুমের কলের পানি পান করি অথচ বায়ার আসার কথা শুনে কত যত্ন দেখাচ্ছে আমাদের । তারা চলে গেলে যেই লাউ সেই কদু । বায়ার আসার কয়দিন আগে থেকেই সকল শ্রমিকদের মহড়া দেওয়া হইয়াছে, যেন কেউ উল্টা পাল্টা অভিযোগ না করে । সকল সমস্যার কথা লুকিয়ে রেখে মিথ্যার জয় গান গাইতে হয় । যাক, সে দিন ভাগ্যক্রমে বায়ার সাহেব আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন ফ্যাক্টরি সম্পর্কে কিছু তথ্য জানানোর জন্য । সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ কড়া নজরে আমাকে নিয়ে গেল । চারপাশে চেয়ে দেখি চামচা গুলো ইশারা করছে, সত্যি বললে চাকরি যাবে, এমনকি ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হবে । আমি এখানেই থেমে থাকি, কারণ পেটের ক্ষুধা বড়ো ভয়ানক জিনিস । এখন আবার নতুন তামাশা, দেশে এলো করোনা ভাইরাস । শুরু হলো লকডাউন, মালিকের নির্দেশে বাড়ি চলে এলাম । আবার ডাকা হলো-ভাবলাম রক্ত পানি করা কামাই, কষ্ট হলেও গিয়ে বেতনটা নিয়ে আসি । না গেলে চাকরি থাকবে না, এসময় চাকরি হারালে না খেয়ে মরতে হবে । যানবাহন বন্ধ, পরিবারের দিকে চেয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে হাঁটতে লাগলাম । কতক্ষণ ট্রাকে কতক্ষণ পায়ে হেঁটে এগোতে থাকি ।

বিভিন্ন চ্যকপোষ্টের আগেই ট্রাক থেকে নামতে হয়, আবার হাঁটি । এভাবেই গভীর রাতে ঢাকা পৌঁছাই । বাড়ি ওয়ালা বাড়িতে ঢুকতে দেয় না । মাঝরাতে নিরুপায় হয়ে নরপিশাচের ভয়ে রাস্তার মোড়ে বড় ডাস্টবিনের গা ঘেঁষে জড়োসরো হয়ে রাত পার করি। সকাল হলে কারখানার সামনে গিয়ে দেখি আমার মত শতশত হত্যভাগা দাঁড়িয়ে আছে আলাদা আলাদা কাহিনী নিয়ে । ফের জানিয়ে দেওয়া হলো, ফ্যাক্টরি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ । এই ছোট্ট কথাটা শোনার জন্য কত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে আমাদের । এখন কি করবো মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ।

সারাদেশে আর্মি পুলিশের নজরদারি, গাড়ি বন্ধ, নৌ পথ বন্ধ , বাসা প্রবেশ করাও বন্ধ, এই পরিস্থিতিতে মরা ছাড়া পথ নাই । ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় চলছে তাণ্ডবলীলা । মাথার উপর সূর্যের তেজ তার গায়ের জ্বালা মেটাচ্ছে । ভাবলাম এই শহর আমার না, যত কষ্টই হোক না কেন আমাকে বাড়ি যেতে হবে । হাঁটতে লাগলাম, অবস দেহটা টানতে টানতে ঘোড়াশালের মোড়ে এসে দেখি একটা পাগলি পলিথিনের পুটলি ছিড়ে বাসি ভাত খাচ্ছে । ততক্ষণে ক্ষুধায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে আমার । পাশে বসতেই পাগলীটা খাবার রেখে এখান থেকে চলে গেল । আমি অবাক হই, তারপর এগুলো খেয়ে আপাতত জীবন রক্ষা করলাম । বড় রাস্তায় উঠে ঔষধের গাড়িগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বহু অনুরোধ করলাম, কেউ কথা শুনলো না । পথিমধ্যে আরো তিন জন সঙ্গী হলো আমার ওরাও গার্মেন্টস শ্রমিক । এদের একজনের বহু চেষ্টায় কিছু পথ নৌকা করে আসলাম । তারপর সেই মাঝি ভাই ঢাকা ফেরত এক মাছের গাড়িতে খালি ড্রামে তুলে দিলো আমাদেরকে। হাত পা গুটিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ মাছের গন্ধে। উঁচু নিচু ঝাঁকুনিতে চোখ বন্ধ করে ড্রামের ভেতর বসে রইলাম। অক্সিজেনের অভাবে, এখানে ঐখানে ব্যাথা যেনো গা ছিড়ে যাচ্ছে । তবু ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে কখন পুলিশের হাতে ধরা পরি। কোন রকমে বাড়ির কাছাকাছি এলাম । ট্রাক ড্রাইভার পাঁচশ টাকার কমে ড্রাম থেকে বের হতে দিচ্ছে না । আমার কাছে কোন টাকা ছিল না কিন্তু কি করবো তুচ্ছ হলেও জীবনটাতো আমার ।

সখ করে বানানো কানের দুল জোড়া ড্রাইভারের হাতে সপে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম । আমার বলে নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম কিন্তু বুঝলাম পৃথিবীর কেউ কারো না। গভীর রাতেই পুলিশে খবর দিয়েছে প্রতিবেশীরা । কিছু বুঝে উঠার আগেই এক কাপড়ে আমাকে গেলো পুলিশ গ্রাম থেকে অনেক দূরে বিলের দ্বারে একটা নির্জন স্কুলে । মায়ের কান্নার আওয়াজ আমার বুকের ভেতরটা থেঁতলে দিচ্ছে । আমার আর্তনাদ কেউ শোনেনি । কাছের মানুষগুলো ভয়ে মুখ লুকালো। কুষ্ঠ রোগীর মতো বনবাসে দিয়ে গেল আমাকে । ভয় আর উৎকণ্ঠা স্তব্ধ হয়ে গেছি আমি । রাতের ঝি ঝি পোকারা শা শা কলরবে আমাকে খেতে বসেছে।

বাতাসের শব্দে আতকে উঠি এই বুঝি আজরাঈল আমার গলাটা চেপে ধরতে এলো। এই ঘরই যেন আমার কবর। আজ স্বজন কেউ আসলো না সাথে। আমার অপরাধ আমি ঢাকা থেকে এসেছি, কেউ খোঁজ নিলো না, আমি কেন ঢাকা গিয়েছিলাম, কে চলে আসতে বাধ্য করলো । এই শাস্তি কার পাওয়ার কথা ছিল । বিছানা বিহীন মেঝেতে ঘুম আসা দূরের কথা ভয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এই ভয়াবহ দুর্বিসহ রাতে আমাকে ছিঁড়ে খেতে নষ্ট শিয়াল কুকুর গুলো ও একবার উঁকি দিলো না । ভাবলাম এই দেশ সভ্য হয়ে গেছে। দশ দিন ধরে দিনে একবেলা ভাতের একটা পুটলি মাঠের এক কোণে রেখে যায় আমার মা । মায়ের বুক ফাঁটা কান্না আমাকে বাঁচার প্রেরণা দেয় । দুঃখ হয় সভ্য মানুষগুলো নিজেদের গরু ছাগলগুলো ও সন্ধ্যার আগে ঘরে তুলে। আমি সেই পশু গুলোর চেয়ে প্রয়োজনহীন হয়ে গেছি। আজ সকালে হঠাৎ একদল লোক এসে বলল, তু মি বেরিয়ে এসো, সকল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলে দেওয়া হয়েছে, তোমাকে ঢাকা যেতে হবে। তোমাদের উপর জাতির ভাগ্যের চাকা নির্ভর করছে। তোমাদের মতো যোদ্ধারা ঘরে বসে থাকলে চলবে না। হা হা হা হা হা হা একি বলছেন, আমাকে ছুঁইলে আর কেউ মরবে না? যখন বিদেশি বায়াররা বাংলাদেশে কাজ বন্ধ করতে চাইছে ঠিক তখনই গার্মেন্টস শ্রমিকদের শরীর থেকে করোনা উধাও হয়ে গেলো! গার্মেন্টস মালিকদের লোকসান হবে মনে হচ্ছে এই জন্যেই অপদার্থ গরীব মানুষ গুলো আজ দামী হয়ে উঠলো তাই না? কিন্তু আজ যদি আমরা কেউ কাজে না ফিরি তাহলে তাদের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে দেখুন তো ।

যুদ্ধে শুধু প্রজা মরে রাজা থাকে অন্তরালে। আমরা যে মানুষ এই কথা অনেকেই ভুলে যায় । দিনের পর দিন কাটিয়ে দূর্বল বলে পাওনা টাকা দিতে তালবাহানা করে। সামান্য অপরাধে মজুরি কাটে, ভাবে না শ্রমিক বিহীন মালিক হওয়া যায় না । এত কিসের অহংকার আপনাদের, ছোট চুলে রং মেখে বেগানা হয়ে ঘুরে বেরালেই শিক্ষিত হওয়া যায়?? প্রত্যেকটা নারী শ্রমিকের মাথা কাপড় থাকে শালীনতার সাথে চলে ওরা লোক ঠকাতে বুঝে না । তবু সমাজ এদের এত উপেক্ষা কেন করে? ভদ্র সমাজ বলে বেড়ায়, এই দেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে আছে । কিন্তু এই দুর্দিনে যদি গরীব মানুষেরা তিন মাস ঘরে বসে খেতে না পারে তাহলে এই দেশ কোন উন্নত দেশের দাবি করে? কোন সুরক্ষার কথা বলছেন, যে কারখানা গুলোতে প্রতি পাঁচশো জনে ব্যবহার করে একটা বাথরুম সেখানে দেবেন সুরক্ষা? গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেশির ভাগ অশিক্ষিত, গরীব, ওদের জীবনের অবমূল্যায়ন করে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কারণ ওরা মরলে বিচার করার কেউ নেই, যেমন অতিথেও ছিলো না । আজ এই অশিক্ষিত মানুষগুলোর উপরেই যদি অর্থনীতির নির্ভর করতে হয়, ওরাই যদি দেশের হাল ধরবে তাহলে বড় বড় ডিগ্রী ওয়ালা উঁচু দালানে বসে থাকা ভদ্র লোকদের কি ক্ষমতা আছে? গরিবদের শোষণ করে টাকার পাহাড় গড়লেও দেশের কোন কাজে আসে না ওরা। ধিক জানাই ওদের । আজ যদি এই সমাজের মুখোশ না খুলি, মানুষ হিসেবে বিবেকের কাছে অন্যায় করা হবে,ইত্যাদি ইত্যাদি । ফাতেমা তার মনের কথা চিৎকার করে বলে যাচ্ছে । উৎসুক জনতার ভীরে আমি ও অপদার্থের মতো শুনছিলাম । সত্যিই কারো সময় এক যায় না । কখন কাকে কার উপর নির্ভর করতে হয় কেউ জানে না । শুধু জানি, শ্রমিক দুমুঠো ভাতের আশায় চিরকাল নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে আর তাদের শ্রমে ঘামে শোষক হয়েছে অধিপতি।
-আনোয়ারা খাতুন

লেখক: কবি ও গল্পকার